Thursday, 12 March 2015

পায়ে পায়ে সুন্দরবন আর দুই বন্ধুর গল্প

কিছুদিন আগে অফিসের কয়েকজন মিলে সুন্দরবন বেড়িয়ে এলাম। সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল "পায়ে পায়ে ট্রাভেল এজেন্সি"। সংস্থার কর্ণধার রজত পোদ্দার নিজে আমাদের সঙ্গে গিয়ে সব দেখাশোনা করেছিল। রজত আর ওর সব কর্মচারীদের অসাধারণ সার্ভিসে আমরা সবাই মুগ্ধ। রান্নাবান্না থেকে থাকার ব্যবস্থা, বোটে করে বিপজ্জনক খাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া থেকে বনবিবির পালা দেখানো - সবকিছু চমৎকার। কত রকম নতুন নতুন মাছ খেয়েছি দু'দিন বোটে বসে তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের পানের আসর আরেকটু সাজিয়ে তুলতে রজত বোট নিয়ে এপার ওপার করেছে কাঁচের গ্লাসের খোঁজে।

       তবে রজতের একটা অন্য পরিচয়ও আছে। ও আমার জীবনের প্রথম বন্ধু। রজত আর আমি প্রি-স্কুল থেকে একসাথে পড়েছি। বাড়িও ছিল একদম কাছেই। তাই সারাদিনই চলত আড্ডা -খেলা। এখনও পুরনো অ্যালবাম খুললে আমার জন্মদিনের ছবিতে ওর হাসিমুখ প্রায়শই বেরোয়। কৈশোর বা সদ্য যৌবনের যেকোনো ঘটনার সাথেও দু'জনের অনেক স্মৃতি। ওর বউ আমাদের ক্লাসমেট। আমার বউয়ের সাথে আমার সে সময়ের প্রেমেও রজত প্রচুর খেটেছে। তারপর অনেক ক্রিকেট ব্যাট, জমানো টিকিট, কমিক্স বই, টিউশান ক্লাসের মত বন্ধুত্বটাও হারিয়ে গেল সময়ের স্রোতে। খবর রাখলাম একে অন্যের, কিন্তু যোগাযোগটা প্রায় চলে গেল। ব্যস্ত হয়ে গেলাম দু'জনে কবে যেন।

       বড় হয়ে বন্ধু পাওয়া মুশকিল; কিন্তু তার চেয়েও মুশকিল বড় হয়ে ছোটবেলার বন্ধু ফেরত পাওয়া। আমি ভাগ্যবান। দু'টোই পেয়েছি। আমার এখনকার বন্ধুরা, যারা আমার অফিস কলিগও বটে, ভীষণ কাছের। মনেই হয় না ওদের আগে চিনতাম না। তেমনি রজতও ফিরে এলো হঠাৎ করেই। এবারে সুন্দরবনে পৌঁছে, লঞ্চে ওঠার সময় যখন ওর সাথে দেখা হল। মনেই হলনা যে পনেরো বছর আমরা একে অন্যকে সামনাসামনি দেখিনি। অনেকদিন পর বাড়ি ফিরে, নিজের ঘরে এলে মানুষের যেমন একটা স্বস্তি বোধ হয়, রজতের সাথে দেখা হয়েও তেমনই লাগল। তারপর রঙিন আড্ডা, পুরনো কথা, মাঝখানের সময়টার গল্প সব চলল। আমার এখনের বন্ধুরাও ওর বন্ধু হয়ে গেল চট করেই। সবাই মিলে একটা দল হলাম।

       আর হারিয়ে ফেলব না রজতকে। আর একটু জড়িয়েজাপটে রাখব বন্ধুত্বকে। যোগাযোগ বাড়িয়ে আর একটু যত্ন দেব সম্পর্কটাকে।

       সুন্দরবন থেকে আসার পর সবাই জিগ্যেস করল বাঘ দেখেছি কিনা। দেখিনি। মেয়েকে বলার জন্য নিয়ে আসতে পারিনি দুর্ধর্ষ কোনো অভিজ্ঞতা। শুধুই নিজের জন্য উদ্ধার করে এনেছি হারিয়ে যাওয়া, মান্ধাতার আমলের একটা পুরনো বন্ধুত্ব - যার রঙটা এখনও ঝকঝকে সোনার মত, আর আর তার ওপর বসানো আছে একটা মহামূল্য হিরের টুকরো - ছোটবেলা!

Sunday, 8 March 2015

শীত থেকে গরমের দিকে

এই যে সময়টা, শীত চলে গেছে অথচ গরম পড়েনি, এটাই তো বসন্ত। ভোরের দিকে শীত শীত, বেলা বাড়লেই তাতানো গরম, সন্ধের দিকে মনোরম, রাতে আবার ঠাণ্ডা, এগুলোই বসন্তের লক্ষন। কিন্তু আমি, শীত চলে গেছে, এটা বুঝি একটু অন্যভাবে। বলছি সেটা কি।

       শীতকালের যেকোন দিন বড়সড় দুটো ভাগে বিভক্ত - সকাল আর রাত। সকাল হয়, নিরবিচ্ছিন্নভাবে সারাদিন রোদেলা থাকে, তারপর ঝুপ করে হঠাৎ সন্ধে নেমে রাত হয়ে যায়। ঘড়ির দিকে না তাকালে 'এখন বারোটা বাজে নিশ্চই' বা 'এবার বিকেল হবে' এটা বলা মুশকিল। গরমকালের চরিত্র একদম অন্য রকম। সব সময় বদলাচ্ছে। অ্যালার্ম দিয়ে ভোররাতে উঠে যদি বসে থাকা যায় তাহলে ঊষা, ভোর, সকাল, বেলা, দুপুর, বিকেল, সন্ধে, রাত্তির সব আলাদা করে বোঝা যায়। ঘড়ি না থাকলেও। দিনের প্রতিটা ভাগের আলোর চরিত্র, হাওয়ার ধরন একদম আলাদা। খালি চোখে, খুব একটা খেয়াল না করেও সেটা বোঝা যায়।

       এবার সে সময় আসছে। শীতকালের নিজস্ব মজা আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু গরমের এই বহুমুখী, বর্ণময় ব্যাপার তার মধ্যে নেই। আম, ঠাণ্ডা জলে হুড় হুড় করে চান, বিকেল বেলার দক্ষিণের হাওয়া, কালবৈশাখীর দাপট সব নিয়ে এবার সে হাজির হবে।

       সবই ঠিক আছে, শুধু দুপুরের দিকটায় কারেন্ট চলে গেলেই একটু... হেঁ হেঁ...

Saturday, 7 March 2015

হাতের লেখা

ব্যাপার খেয়াল করলাম ক'মাস আগে - হাতের লেখাটা একদম গেছে। হাত কাঁপছে, টানগুলো ঠিকঠাক হচ্ছে না। জিনিষটা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে নিজের হাতের লেখা নিজেই চিনতে পারছি না। কিন্তু কি বাদশাহি আমলটাই না ছিল! কতরকমভাবে লিখতে পারতাম। কতজনের হাতের লেখা নকল করে, তাতে নিজের কায়দাকানুন মিশিয়ে নতুন 'ক্যালিগ্রাফি' আমদানি করতাম। বসন্ত-টসন্তর পরোয়া না করে কাগজে কাগজে ফুল ফুটত বারোমাস। কতরকম কালি, কতরকম পেন, কত ছিরিছাঁদ। কিছুদিন আগে বুঝলাম সে সময় অস্ত গেছে। পেনের দাম যত চড়ছে, তত নামছে হাতের লেখার মান। ক'গাছা চুল দিয়ে টাক ঢাকার কায়দায় এখন বুলিয়ে বুলিয়ে লেখা দাঁড় করাতে হয়, নয়ত সেদিকে তাকাতে নিজেরই লজ্জা করে। যতই বেঁকিয়ে, চুরিয়ে, ওপরে ধরে, নিবের কাছে পাকড়ে, মোটা পেন কিনে, সরু জেল দিয়ে চেষ্টা করি না কেন, ফাইনাল আউটপুট যে-কে-সেই! কাউকে তিন লাইন নিজে হাতে লিখে দিতে গেলেই বুক ধড়ফড় - কি ভাববে কে জানে। হয়ত রোজ দু'পাতা করে লিখলে খানিকটা শোধরাবে ব্যাপারটা, কিন্তু সে হয়না। কুঁড়েমো আর কি!

       আমাদের স্কুলে বেশ রসিক একজন বাংলার স্যর ছিলেন। আমার হাতের লেখা দেখে বলেছিলেন, কেরিয়ারে বিশেষ সুবিধে না করতে পারলে আমি যেন একটা গাছতলা দেখে কাগজকলম নিয়ে বসে যাই। ভাড়ায় প্রেমপত্র-টত্র লিখে দু'পয়সা করতে পারব।  সে পথ চিরতরে বন্ধ।

       এসব হয়েছে ব্যাটা কম্প্যুটারের জন্য। এ যন্ত্র এমন এক কৃত্রিম পারফেকশানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে যে হাতের যেকোন কাজ গ্যালারি পেরিয়ে মাঠের বাইরে। 

       সি পি এম বলেছি কম্প্যুটার লোকজনের চাকরি খাবে। সেটা হয়নি বটে, তবে আমার হাতের লেখাটি খেয়ে একদম হজম করে ফেলেছে। 

Friday, 6 March 2015

প্রতিবাদ থেকে দূরে

ইদানীং নিজের মনে একটু টানাপোড়েন কাজ করে। হয়ত কিছুটা অপরাধবোধও। সমাজে, আমাদের চারদিকে যা যা ঘটে চলেছে তা যে কোনো মানুষকেই নাড়িয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ঠ। যার যা জোরের জায়গা তাই দিয়ে, কিছুটা হলেও প্রতিবাদ করা, বা নিদেনপক্ষে রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দেওয়া যে এসব আমার ভালো লাগছে না এবং এর আমি বিহিত চাই, এটা বোধহয় খুব জরুরী হয়ে পড়েছে আজকাল। আমি যেহেতু একটু আধটু লিখতে পারি, বেশ খানিকটা অনুভব ক্ষমতাও আছে বলে মনে করি, তাই শব্দই হতে পারে আমার হাতিয়ার। ঝলসে উঠে টুকরো টুকরো করে দিতে পারুক না পারুক,তরবারি উঁচিয়ে ধরে জানান দেওয়াটা সত্যিই আজ দরকারি। 

       তবু কেন জানিনা আমি তা করিনা। রাগে মাথার রগ দপদপ করে, কান্না চাপতে গিয়ে গলার কাছটা ব্যথা করে ওঠে, ভয়ে মুখের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, তবু এইসব নিয়ে বিশেষ কিছু বলে ওঠা হয়না। আমার নিজের ব্লগ আছে সেখানে চাইলে লিখতেই পারি, ফেসবুকের দেওয়ালে লিখতে পারি, খবরের কাগজ বা পত্রিকাতেও একটু আধটু লিখি, তাই সেখানেও নিজের বক্তব্য প্রকাশ করা যে খুব কঠিন তা নয়। কিন্তু লিখিনা। রাষ্ট্রের ভয় পাই?  আমার যে অতদূর এলেম আছে  তা মনে হয়না। তাহলে? কেন লিখিনা? কেন ব্যঙ্গ করিনা প্রত্যেকদিন হয়ে চলা জোকারপনার? কেন প্রতিবাদ করিনা দিনরাত ঘটে চলা হিংসা, হানাহানি, ধর্মের নামে চুড়ান্ত অধর্মের?

       আজ অনেক ভাবছিলাম এটা নিয়ে। কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকার পর মাথাটা যখন একটু ঠাণ্ডা হল তখন মনে হল যে যা কিছু নিত্যদিন ঘটছে, যাকে বলে 'কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স', তাতে সবারই কিছু না কিছু বিশেষ মতামত থাকতে হবে, বা থাকলেও তাই নিয়ে কথা বলতে হবে, এমন কোন মানে আছে কি? মেনে না নেওয়া মানেই কি প্রতিবাদী আওয়াজ তোলা? চুপ করে, বিষ কি গিলে ফেলা  যায়না? বলার না থাকলেও বলতেই হবে কিছু না কিছু? ছোটবেলার গল্প যেমন এখন ফিরে ফিরে আসে লেখায়-গল্পে, তেমনি আজকের কথা হয়ত অক্ষরের সারি হয়ে হানা দেবে ভবিষ্যতে কখনও;  সময়মত তার প্রকাশ হবে।আবার হয়ত এখনই কোন কোনদিন এখনই বেরিয়ে আসবে গোলাবারুদ। বা হয়ত হবেই না কক্ষনও। থিতিয়ে যাবে দৈনন্দিনতার ঘূর্ণিপাকে। দেখাই যাক না। স্বাভাবিকভাবে যা আসে সেটাই কি সৎ নয়? চাপানো, জোর করে প্রকাশের মধ্যেও তো একটা অশোভন কৃত্রিমতা আছে। 

       তার চেয়ে যেটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি করতে পারছি তাই করিনা। অশান্তি, অন্যায়ের প্রতিবাদ যেমন জরুরি, তেমনই তার পাশাপাশি সুস্থ, সাবলীল গড়ে যাওয়াটাও কি দরকারি নয়? একদল দাবানল নেভাবে আর একদল নতুন গাছের চারা রোপণ করে যাবে এটাই তো সুস্থতা, এতেই তো ভারসাম্য। 

       জানি এই মুহূর্তে কোথাও না কোথাও খুন হচ্ছে, হচ্ছে ধর্ষণ, অস্ত্রের বোঝা খুলে সওয়ারি চলছে খোলাখুলি, গোপন ডেরায় জরিপ চলছে ক্ষমতা দখলের। তবু আমি যদি তা নিয়ে কিছু না বলে,কয়েকটা বাচ্ছাকে আকাশ চেনাই, ছায়াপথ খুঁজি সাথে বসে, কালপুরুষের বেল্ট বানাতে শেখাই ওদের, বলি দেশ-বিদেশের গল্প, বন্ধুত্ব করাই পাড়ার কুকুরছানাগুলোর সঙ্গে,পাখি কিনে উড়িয়ে দি, ভাল কিছু সাহিত্যর চেষ্টা করি ঘাড় গুঁজে, নিজের অফিসের কাজটা করি ভালো করে যাতে কোম্পানিটা বড় হয়, আরও কিছু লোকের চাকরি হয় আর দেশের আর্থিক উন্নতি হয় নামমাত্র হলেও -  সেটা কি মুঠো উঁচিয়ে প্রতিবাদের চেয়ে কম কিছু? ভাঙন আটকানো যতটা দরকার, নতুন গড়ার কাজও কি অনবরত দরকার নেই বেঁচে থাকতে? 

       তাই, যা ভালো পারি, অসৎ না হয়ে, অবান্তর না হয়ে, করে যাই। অন্ধকারে মশালের আলো হয়ত ধরতে নাই পারলাম, নতুন ভোর এনে কালো রাত কাটানোর চেষ্টা তো করতেই পারি। যার যা কাজ, সেটা ভালো করে করলেই তো সবটা হয়ে যায়। যায় না?

Saturday, 21 February 2015

প্রেম প্রতিজ্ঞা পাকামো

'ইস লিয়ে ম্যায়, গাঙ্গাপুত্র দেবব্রৎ, চারো দিশায়োঁ, ধরতি, অউর আকাশ কো সাক্সি মানতে হুয়ে ইয়ে প্রতিজ্ঞা করতা হুঁ কে আজীবন ব্রহ্মচারী রহুঙ্গা, বিবাহ নেহি করুঙ্গা...' মুকেশ খান্না দু'হাত চিতিয়ে ডায়লগটা টিভির স্ক্রিনে আছড়ে দিতেই কেঁপে উঠল বিশ্ব সংসার - আকাশ খান খান হয়ে গেল গুড়ুম গুড়ুম বাজ পড়ে, সমুদ্রের জল উথাল পাথাল, মেয়ের বাপ ধীবর বেচারা কাঁচুমাচু হয়ে এককোণে, অন্তরীক্ষ থেকে দেবতারূপী এক্সট্রারা মুঠো মুঠো ফুল ফেলছে, দৈববাণী বলে দিচ্ছে এবার থেকে এর নাম হল ভীষ্ম... এই হল প্রতিজ্ঞা ব্যাপারটার সাথে আমার 'লাইভ' পরিচয়। এর আগে মহাভারত পড়েছি, বিভিন্ন পুরাণের গল্পও, ব্যাপারটা জানতাম, কিন্তু সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়নি। এইবার বুঝলাম 'প্রতিজ্ঞা' ব্যাপারটা মারাত্মক! দিয়ে দেওয়া মানে ধরে নেওয়া হবে এই শেষ কথা; পৃথিবী রসাতলে যাক, এ কথার নট নড়নচড়ন! তবে একটা প্রশ্ন মাথায় এসেছিল - আমাদের পাড়ার গোপালকাকুও বিয়ে করেনি, বললেই বলে করবেও না কখনও, এরকমই কাটিয়ে দেবে ভাইপো-ভাইজি নিয়ে। তা তাকে নিয়ে তো তেমন কিছু হয়নি? বরঞ্চ বড়-ছোট সবাই বলাবলি করে শেষ বয়েসে লোক হাসিয়ে ঠিক ফাঁসিকাঠে উঠবে ব্যাটা। নিজেকে বোঝালাম, ও সব সত্য যুগের ঘটনা, এখনের মত ঘোর কলি নয়, তাছাড়া সব রাজা রাজড়ার ব্যাপার, ছেলে বাপের বিয়ে দেবার জন্য ব্যাচেলার থেকে যাবে এটা কেরানীর ছেলে গোপালকাকুর সাথে মিলবে কেন। আর পরে এও খেয়াল করলাম যে গোপালকাকু 'প্রতিজ্ঞা' বলেনা, বলে 'পোতিজ্ঞা'। গলাও মিকি মাউস মার্কা'। তা সেই 'পোতিজ্ঞা' যে স্বর্গলোক অবধি পৌঁছবে আর তাতে সুগন্ধি ফুল বর্ষণ হবে, এটা ভাবা নেহাতই বাড়াবাড়ি!

       যাই হোক, এ ভাবেই ঘরোয়া 'মাক্কালীর দিব্যি' থেকে গুরুগম্ভীর 'প্রতিজ্ঞা'য় উত্তরণ হল। প্রায় একই সঙ্গে হিন্দি সিরিয়ালের খাল-বিল পেরিয়ে হিন্দি সিনেমার চওড়া নদীতে ডিঙি ভাসল আসতে আসতে । প্রেম-প্রতিজ্ঞা-পাকামোর ঝোড়ো হাওয়া এসে লাগতে থাকল মুহুর্মুহু! ঘরোয়া মাইরি-মাকালী, দেবভাষা প্রতিজ্ঞার গায়ে গায়ে, গলায় রুমাল, সাদা প্যান্ট, কান ঢাকা চুল, সফেদ থান কাপড়, ডুকরে উঠে চুড়ি ভাঙা, রক্তমাখা 'কসম', 'ওয়াদা', 'বচন' এসে জুড়তে লাগল আমাদের দৈনন্দিন ভোক্যাবে। এর বাংলা সংস্করণে 'কথা দেওয়া' ব্যাপারটাও চালু হল আসতে আসতে। 'প্রমিস' শিখতে তখনও বহু ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটাতে হবে।

  সত্যি বলতে কি, একে নিয়ে যতই মস্করা মাচাই, হিন্দি-বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমার হাত ধরেই বোধহয় আমাদের রোজকার জীবনে 'দেওয়া' কথাকে সিরিয়াসলি 'নিতে' শেখা। পুরান-পঞ্চতন্ত্র-মহাকাব্যে এর বহু উদাহরণ আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সাড়ে পাঁচ ফিট মধ্যবিত্ত বাঙালির কাঠামোয় ওইসব দৈবিক জিনিস ফিট হওয়ার নয়। তাই আগে টুকটাক মিথ্যেগুলো চালাবার জন্য ছিঁচকে মাইরি-মাকালী, আর একটু সিরিয়াস ব্যাপার হলে ঘরোয়া যাহোক কিছুর 'দিব্যি'-র হাতযশই সম্বল ছিল। যেমন, শীতের রাত সাড়ে বারোটায় এসে দরজা পেটানো মাতাল দাদাকে বউদি দরজা না খুলে দিলে পাড়াসুদ্ধু লোক জানতে পারত দাদা বউদির দিব্যি দিল যে আর কক্ষনও খাবেনা। পরদিন সকালে লুঙ্গি গুটিয়ে ফুলকপি দর করার সময়ই সেসব আর কেউ মনে রাখত না - বউদি তো না-ই। আবার রাত হলেই রোজের রুটিন। সবাই জানত ওসব কথার কথা, কুয়াশার মতই উবে যাবে দিন ফর্সা হলেই।  

  তবু কথা দেওয়া, কথা রাখার স্বপ্ন, কথা ভাঙার ভয়, আর শেষমেশ সব হিসেব মিলিয়ে দিয়ে সেই কথা রাখা - তাতে যদি মরতেও হয় হল, এ ভাবেই তৈরি হয়ে উঠেছে একের পর এক হিট-ফ্লপ হিন্দি-বাংলা ছবি। সিটের একদম সামনে এসে, ধুকপুকে বুকে মানুষ দেখে গেছে এই 'জবান' দেবার পরীক্ষা, 'কসম' খাওয়ার অক্লান্ত উপাখ্যান...

  বাবা মিঠুন মারা যেতে, ছেলেকে দেখিয়ে মা স্মিতা পাটিল 'কসম' খেলেন এই ছেলে বড় হয়ে বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবেই। কথা রাখতে ছেলে বড় হয়ে আবার হয়ে উঠল ডাকাবুকো আর এক মিঠুন। বদলা নিল গোবেচারা বাবার ওপর হওয়া সব অন্যায়ের, মাকে ফিরিয়ে দিল সম্মানের সংসার... 
একের পর এক নায়ক সমুদ্রের ধারে, বিস্তীর্ণ পাহাড়ের ঢালে, তুমুল বৃষ্টিতে, গোপনে বা হাজার গোপিনী সাক্ষী রেখে বলে গেছে 'ওয়াদা রাহা সনম , হোঙ্গে জুদা না হম'। ভাষার তারতম্য হয়েছে হয়ত কখনও সখনও, কিন্তু মূল ভাব বদলায়নি একটুকুও। তারপর ভিলেনের চালে বা নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির প্যাঁচে সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন।  মদের ফোয়ারা, চোখের জলের স্রোত। কথা রাখতে শেষ সিনে সুখের মিলন বা একে অপরকে না পেলে এক সাথে নিজেদের শেষ করে দেওয়া...

  রাগি বাবা অথবা অভিমানী মা রাতের অন্ধকারে দেখা করেছেন ছেলের প্রেমিকা বা মেয়ের প্রেমিকের সঙ্গে। 'ওয়াদা' করিয়েছেন যে তাঁর মেয়ে বা ছেলের সাথে আর কখনও দেখা করবেনা প্রেমিক বা প্রেমিকা। অথবা চলে যাবে ওই জায়গা ছেড়ে কোন দূর শহরে। নাহলে ভয়ঙ্কর কোন ক্ষতি হবে তার ভালোবাসার - ভগবানের দিব্যি! মনের মানুষের মঙ্গালার্থে তাকেই ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে নায়ক বা নায়িকা। টুঁ শব্দটি করেনি অবধি। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে হার মেনেছে মা-বাবার জেদ। তারাই বলে দিয়েছেন আসল কারন, মিলিয়ে দিয়েছেন প্রেমিকযুগলকে...

  শহুরে বাবু গ্রামে এসে প্রেমে পড়ে সেখানের এক লাজুক মেয়ের। অসম পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থার প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে ধরা দেয় প্রেমিকা। দুর্নাম রটে গ্রামে। বিচ্ছেদ যখন অনিবার্য তখন মেয়েটি জীবন দেয় ছেলেটির জন্য। যাবার আগে কথা দিয়ে যায় সে আবার আসবে। কথা রাখতে হুবহু দেখতে আরেক অনাঘ্রাতার শরীরে জায়গা করে সেই অশরীরী আত্মা। জাতিস্মর হয়ে ফিরে আসে 'বাবুজি'র কাছে...   

  'শোলে'। অমিতাভ-ধর্মেন্দ্র জয়-ভিরু হলায় গলায় বন্ধু। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। ঠাকুর সঞ্জীব কুমার দু'জনকে নিয়ে এলেন ডাকু গব্বরকে জব্দ করতে। শর্ত - জীবন্ত গব্বরকে চাই তাঁর। নিজে হাতে শেষ করবেন তাঁর সুখের পরিবারকে যে ধ্বংস করেছে তাকে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, হাসি, কান্না, প্রেম পেরিয়ে গল্প পরিণতির দিকে।  এবার শেষ কামড় দেবার জন্য যেতে হবে জয় অথবা ভিরুকে। এই যাওয়ার অর্থ মৃত্যু। কে যাবে? কিউই চায় না অন্যকে বিপদের মুখে ছাড়তে। জয় বলল, এত ভাবার কিছু নেই। প্রতিবারের মত সে পকেট থেকে বার করল তার পয়া 'কয়েন'। যে জিতবে সে যাবে। শূন্যে উড়ল কয়েন। প্রতিবারের মত জিতল জয়। ভিরু জানতেও পারল না এক-রকমের দু'পিঠ ওয়ালা কয়েন দিয়ে আজীবন তাকে ঠকিয়ে এসেছে জয় আর এই শেষবারও তাকে ঠকিয়ে, প্রেমিকার কাছে রেখে চলল মৃত্যুর মোলাকাত করতে।  আর ফিরতে পারল না জয়। ভিরু গিয়ে ধরাশায়ী করল ডাকাতসর্দারকে। রক্ত তার মাথায়। বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে যখন খুন করতে যাবে গব্বরকে, শুভ্রকেশ প্রৌঢ়ের ছায়া পড়ল রণভূমিতে, 'তুমি ওকে আমার হাতে তুলে দেবে। তোমার বন্ধু আমাকে "ওয়াদা" করেছিল আমাকে জীবন্ত গব্বর দেবে।' মৃত বন্ধুর দেওয়া কথা রাখল বন্ধু, গিলে ফেলল নিজের হিংস্র রাগ...

  এছাড়াও প্রচুর কঠিন প্রতিজ্ঞার উদাহরন ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার ছায়াছবির আনাচে কানাচে। কত শত হিরে জহরতের টুকরো ছড়ানো গানের সুরে রয়েছে বিরহ-অভিমানের কথা দেওয়া-নেওয়ার রূপকথা। আছে ওয়াদা-কসমের সকরুণ ব্যাকড্রপে মা-ছেলে, বাবা-মেয়ের চরম ঘাত-প্রতিঘাত। উল্টো পুরাণও আছে। এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর দিয়ে ফেলা কথা না রাখতে পারলে ফল কি হতে পারে এক মোক্ষম সংলাপে বুঝিয়ে দিয়েছে উগ্রপন্থী নেতা - দেওয়া 'জবান' না রাখতে পারলে তার 'জবান' (জিভ) টেনে ছিঁড়ে নেওয়া হবে। ভয়ঙ্কর!

  আজ এই গল্পগুলো বেহিসেবি আড্ডায় অজস্র হাসির খোরাক দেয়। ছোটবেলার কাজল ধ্যাবড়ানো ছবির মতই মজা লাগে হঠাৎ কোন দুপুরে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে এমন কিছু সিনেমা পেয়ে গেলে। বহু যত্নে বোনা সেদিনের সেই তুখোড় ডায়লগ আজ ভরদুপুরে জোগান দেয় কমেডির হররার। কিন্তু তখন তো তেমন লাগত না! এ আর এমনকি আগের কথা যে এত 'ডেটেড' হয়ে গেল ধ্যান-ধারনা? যত্রতত্র ইন্টারনেট আর রকমারি গ্যাজেটের ছড়াছড়ি ছাড়া এমন কি নতুন এল জীবনে যে এই সেদিনের সিরিয়াস কথা আজ কমিক ঠেকে? আসলে তা বোধহয় নয়। যে কারনে দশ বছর আগের গল্প এখন 'পিরিয়ড' লাগে, সেই গ্লোবালাইজেসনের দুদ্দাড় বাইকে চেপেই আমরা হড়কে গিয়েছি কয়েক হাজার আলোকবর্ষ। সামাজিক পটভূমিকাটা এতটাই বদলে গেছে যে এক যুগ আগের নিজেকে স্বীকার করতেই কেমন লজ্জাবোধ হয় আজকাল। এই সেদিনও জীবন এতটাই ইনোসেন্ট ছিল যে সেসব ভাবাবেগের কথকতা নাগাড়ে বিশ্বাস করে গেছি সকলে। নায়ক মায়ের কাছে কথা না রাখতে পারার কষ্ট আমাদের  গলার কাছেও কি ডেলা হয়ে জমে থাকেনি কোনদিন? কথা দিয়ে মারা যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকা যে আবার এক হবে পরের জন্মে তা কি আমরাও বিশ্বাস করিনি নাগাড়ে? জামার কলার, প্যান্টের ঘের, সালোয়ারের কাটিং, চুলের ফের, শাড়ির আঁচলের ডিজাইনের সাথে সাথে কোন অজান্তে যে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে গেছে কথা দেওয়া আর কথা রাখার এক সরল অথচ গভীর মূল্যবোধ, আমরা টেরও পাইনি কেউ। অন্যদের তো বটেই, নিজেকেও নিজে কথা দিয়েছি অসংখ্যবার। হয়ত একটু নাটকীয় ভাবে বলেছি, কিন্তু তাতে সততার কোন অভাব ছিলনা সেদিন। কথা রাখতে পারিনি সবসময়, কিন্তু না রাখতে পেরে অপরাধীও কি হইনি বিবেকের কাছে? আবার হয়ত কখনও জীবন থেকেও 'কসম-ওয়াদা'র গল্প ধার নিয়েছে চলচ্চিত্র, বাস্তবের কোন কথা না রাখার মর্মান্তিক পরিণতি হাল ফিরিয়েছে বক্স অফিসের। এরকম ভাবেই 'রিল' আর 'রিয়েল' দুটো সমান্তরাল জীবন কথা চালাচালি করে পাশাপাশি হাতেহাত পথ হেঁটেছে আজীবন। 

  তারপর দিন বদলালো। ঝকঝকে স্মার্ট জীবন এসে থাবা বসাল ছাপোষা সেন্টিমেন্টে।  বি আর থেকে প্রেম হয়ে আদিত্য চোপড়ায় ল্যান্ড করলাম সদলবলে। বস্তুবাদিতা শেখাল শর্তসাপেক্ষে বাঁচা। সিনেমাও গায়ে গায়ে ঘেঁসে এল জীবনের। আরও বেশি বস্তু, আরও বেশি বাস্তব জায়গা করে নিল সেলুলয়েডে। 'কসম', 'ওয়াদা', 'বচন', 'কথা দিলাম'-কে সরিয়ে কবে যেন ঢুকে পড়ল আলপটকা 'প্রমিস'। হাতে হাতে তালি মেরে ছোট্ট একখানা 'প্রমিস' করে এখনকার নওজয়ানেরা। যে প্রমিস করে সেও মনে রাখেনা সে কথা, যাকে দেয় সেও ভুলে যায় আড়াই পা গিয়ে। আসলে যার-যার তার-তার জীবনে এসব ছেঁদো সেন্টিমেন্টের জায়গা নেই মোটে। হোয়াটসঅ্যাপের ফাইভস্টার ঘাটে সাধাসিধে ডিঙিনৌকো ভেড়েনা কক্ষনও, মূল্যবোধ এখন মূল্যধরে দেওয়া যায় মোবাইল এর ব্যালেন্স থেকেই, 'কসম' ওয়াদা'র মত ন্যাতাক্যাতা উর্দু শব্দ উচ্চারন করেনা এন আর আই সিনে-ললনার ওষ্ঠ, ডিজের রিমিক্সে কবে যেন ঢাকা পড়ে গেছে 'কসমে ওয়াদে নিভায়েঙ্গে হাম'-এর ব্যারিটোন...

  তবু আজও কোথাও কোথাও - 'ম্যায় একবার বচন দেতা হুঁ তো খুদকা ভি নাহি সুনতা' - ভাগ্যিস সলমন ছিল, কি দুর্দশাটাই না হত তা না হলে! এপাং ওপাং দাবাং...

(আমার এই লেখাটি 'প্রতিদিন রোববার'-এ ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫-তে প্রকাশিত হয়েছিল।)

Monday, 9 February 2015

অ্যালকেমিস্ট

একটা বয়সের পর জন্মদিন কি আনন্দের? ক্যালেন্ডারের আর একটা পাতা ওলটানোর সময়, মহার্ঘ কেক-এ ছুরি চালাবার মুহূর্তের ব্যাকগ্রাউন্ডে কি সমবেত হাসি হুল্লোড়ের উল্লাস ছলকায়? নাকি কোন স্তিমিত দীর্ঘশ্বাসে আর একটা বছর-মোমবাতি পলকে নিভিয়ে দিয়ে আমরা আরেক পা এগিয়ে যাই নিশ্চিত নিয়তির দিকে? হয়ত দুটোই। তবু এই মহাগ্রহে আর একটু বেঁচে যাবার উচ্ছ্বাস, সমস্ত মায়াবী বন্ধনে আর একটু কষে গিঁট বাঁধার উত্তেজনা নিয়ে আসে আরও একটা সুকুমার ভোর - জাদুকর 'অ্যালকেমিস্ট'-এর মতই নতুন সূর্যের অফুরান জ্যোতিতে আবার করে স্বর্ণাভ হয়ে ওঠে নশ্বর সব কিছু... 

Monday, 15 December 2014

মেসো, মাসি আর মশার গল্প

ভুত-পেত্নি-দত্যি-দানো ইত্যাদিতে আমার অগাধ বিশ্বাস। কোনও বিজ্ঞান, উত্তরাধুনিক থিসিস, উগ্র পড়াশুনো সেই বিশ্বাস টলাতে পারবেনা।  বিশেষ করে অতৃপ্ত আত্মার ব্যাপারটাতে তো আমি সেইসময় থেকেই টোটাল অটল, যেসময় সন্ধেবেলা লোডশেডিং হলে চিমনির আলোয় মাদুরে বসে, পড়া ফেলে 'খুন-খারাবি'তে মনপ্রান ঢেলে দিতাম। অর্জুনের অন্ধকারে তীর চালাবার গল্পটাই আমাকে ইন্সপায়ার করেছিল কিনা এখন আর ঠিক মনে নেই, তবে বিন-বিন আওয়াজ আর অস্থানে-কুস্থানে হুল ফোটালেই, চোখে না দেখেই, প্রায় ব্রুস লি কায়দায়, সপাট চাপড়ে সেরে দিতাম এক একখানাকে। স্কিলটা এমন সাংঘাতিক পর্যায় পৌঁছেছিল যে এক থাবড়ায় দুটো, এমনটি তিনটেও হাঁকড়েছি কখনও সখনও । শব দেহ তুলে তুলে সাজিয়ে রাখতাম চিমনির কাছাকাছি, যাতে হিসেব রাখতে পারি এক এক ঘন্টায় কতগুলোকে ফৌত করেছি। কিন্তু এহেন আমি, যার শত্রু নিধন ক্ষমতা কিনা প্রায় মহাকাব্যিক পর্যায়ের, কোনদিন শেষ করতে পারিনি দলে দলে উড়ে আসা মশক বাহিনীকে। যত মেরেছি, দলে তত ভারি হয়ে হই হই করে তেড়ে এসেছে আর শেষমেশ বাধ্য হয়ে আমাকে মেনে নিতে হয়েছে যে অপঘাতে মৃত মশাদের অতৃপ্ত আত্মার দলই আসলে অশরীরী আক্রমন শানাচ্ছে, যাদের সাথে লড়াই করে ওঠা যেকোন ইহলোকের প্রাণীর ক্ষমতার বাইরে। এক্ষেত্রে এলিয়েনের থিওরিটাও খাড়া করা যেত, নেহাত সেসময় জ্ঞানের পরিধিটা টেক্সট আর রাশিয়ান বইয়েই সীমাবদ্ধ ছিল বলে কল্পনার বাছুরটাকে ন্যাজ মুলে অতটা দৌড় করাতে পারিনি। তা যা হোক, মোটকথা জেনে গেলাম এই মশার সঙ্গে অতি গভীর এক পারলৌকিক যোগ আছে, যার সাথে পেরে ওঠা আমার মত বকধার্মিক বং-পুঙ্গবের কম্মো নয়।  তখন থেকে হাল ছেড়ে দিয়ে, সদাকরুন চিত্তে, বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া, সহস্র অযুত কোটি কামড় খাইয়াছি এবং অন্যদের হাবভাব দেখে দেদার মজাও লুটেছি। 

     কলকাতা থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে, গ্রামঘেঁষা মফস্বলে আমার ছোটবেলা কেটেছে মশাদের সাথে চূড়ান্ত অশান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে। কয়েককাটা জমির ওপর দেড়তলা বাড়িটা ঘিরে ছিল কেয়ারি করা বাগান। দিনের বেলার দেখনশোভা বিকেল হলেই বদলে যেত আতঙ্কে। কোন কেয়ারির কেয়ার না করে, সেই বাগান থেকে পালে পালে মশা এসে ঢুকত জানলা দিয়ে। গ্রিলে জালের ঢাকা, চপচপে করে মাখা বিলিতি কায়দার ওডোমশ কোন কিছুই বাগ মানাতে পারত না সেই মশকাক্রমনের। তারপর এল কছুয়া ধূপ। কিছুদিন ব্যাপার কন্ট্রোলে, তারপর আবার যে কে সেই। মাঝখান থেকে ঠাকমার হাঁপানি এমন বাড়ল যে বাড়িতে তানপুরার পুরনো খোল ঢেকে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা রাখতে হল রাত বিরেতের জন্য। বছরের কয়েকটা সময় মশাদের দাপট একটু কম থাকত। তবে সেটা ঠিক কোন সময়গুলোতে, জীবনবিজ্ঞানে মশার জীবনচক্র ডিটেলে স্টাডি করেও তার সুরাহা করতে পারিনি। তবে মাঝখান থেকে মাধ্যমিকে লাইফ সাইকেলটা কমন আসায় ছাঁকা নম্বর উঠেছিল। 

  শুধু সন্ধে কেন, বিকেলবেলা খেলতে বেরনো থেকেই মোলাকাত হত এই খুদে খুদে সাক্ষাৎ যমদূতদের। কলের বল কাঁচা নর্দমায় পড়ে গেলে, পাঁকে ভেসে থাকা মশার ডিমের স্তরের মধ্যে দিয়ে বুড়বুড়ির জায়গা দেখেই সেটা তুলে আনা হত কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে। আর সেখান থেকে উড়ে আসত শয়ে শয়ে মশা। খুব ফুর্তির বিকেলে মশার ঝাঁক নিয়ে খেলেওছি কখন সখনও। আকাশের রঙ যখন কমলা থেকে বেগনে হয়ে আসত, সেই সময়, আসে পাশে ঝোপঝাড় আছে এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, ওপর দিকে মুখ তুলে 'চুউ-উ-উ-উ-উ' ডাক লাগালেই মাথার কাছে এসে ঝাঁক বেঁধে গোল হয়ে ঘুরতে লাগত মশার পাল। কিছুজন আবার বিশেষ ক্ষমতা নিয়েই জন্মেছিল বোধহয়, কোন ডাক বা কারসাজি ছাড়াই, তাদের মুণ্ডুর চারপাশে এসে বোঁ-- করে ঘুরতে থাকত চাক চাক মশা। দূর থেকে দেখলে মনে হত 'হ্যালো'ওয়ালা কোন মহাপুরুষ হেঁটে আসছেন; শুধু চাকতির রঙটা কালো হওয়ায় পবিত্রতা নিয়ে একটা স্পিরিচুয়াল প্রশ্ন থেকেই যেত। 

  বাংলার কুটির শিল্পর অবস্থা চিরকালই খারাপ। যে কটা কালক্রমে অবশিষ্ট আছে তার মধ্যে মশারি টাঙানো একটা। এমন একটি সূক্ষ্ম আর্ট কয়েকজন দুঃস্থ শিল্পীর হাত ধরে কোনক্রমে টিকে আছে এক এবং একমাত্র মশাদের কল্যানে। এই যেমন আমার বাবা। জ্ঞান হওয়া ইস্তক ভদ্রলোককে দেখে আসছি মশারি টাঙানোর ব্যাপারটা সি পি এমকে ভোট দেওয়া, আমার অঙ্ক খাতার ছিঁড়ে ফেলার মতোই রিলিজিয়াসলি করে আসতে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, রাতে খেতে বসার আগে, পাখাটাকে পাঁচ স্পিডে ঘুরিয়ে, মশারির খুঁট লাগানোর শুরু। দড়ির মাপের কম বেশি, একটা খুঁট নাইলনের, একটা সুতুলির, এইসব চুলচেরা হিসেব দেখে নিয়ে, মশারিটাকে দুর্দান্ত জেলের কায়দায় যখন ছুঁড়ে দিতেন, যেন মনে হত পাঁচ সেরি কাতলা ঘাই মেরেছে, জাস্ট এইবার উঠে আসবে জাল গোটালেই। তারপর চারদিক একদম নিখুঁতভাবে গুঁজতেন গদির এত ভেতর অবধি যে তাকে টেনে বের করে মশারিতে সেঁধনোটা দুর্গম গুহায় প্রবেশের মতোই দুষ্কর হত। তা যা হোক কোনক্রমে ঢোকা তো গেল, আলো টালো নিবিয়ে শোয়ার পরই কানের কাছে মিঠে সানাইয়ের সুর - পোঁ-ওঁ-ওঁ-ওঁ। একটু উপেক্ষা, 'মশারির বাইরে বোধহয়' মর্মে আত্মসান্ত্বনা, তারপর কানের একদম ধার ঘেঁসে ওড়ার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই জ্বলে উঠল মাথার কাছে রাখা টর্চ। এলোপাথাড়ি আলোর রেখা ঘুরতে লাগলো মশারির 'কোনে কোনে মে', যেন লাইটহাউসের আলো জাহাজ খুঁজছে কালো সমুদ্রে। কিন্তু পরিশ্রমই সার, জাহাজ তো দূরের কথা, মাস্তুলেরও দেখা মিলল না। অগত্যা মশারি থেকে বেরিয়ে টিউবলাইট জ্বালাও, তারপর আবার ঢুকে এসে মশা খোঁজা শুরু করো। এই ঢোকা বেরোনোতেই আরও গণ্ডাখানেক সেঁধিয়ে গেল আক্রমের ইয়র্কারের মত; আর ঢুকে শালারা কোন ঈশান কোণে ঘাপটি মারত কে জানে! শেষমেশ মশারি খোলা হল, পাখা বাড়ানো হল, জাল ছোঁড়া হল - আলাপ শুরু হল নতুন করে, খেলিয়ে খেলিয়ে মধ্যরাতের রাগ আবার সমে এসে পড়ল গিটকিরি মেরে।

  মামারবাড়ির দাদু আবার প্রিভেন্সানের থেকে কিওরে বেশি বিশ্বাস করতেন। মাসকাবারিতে চাল-ডাল-মশলা-সাবানের সঙ্গে জাম্বো সাইজের ডেটল আসত। মশারি ছাড়া শুতেন, সারা রাত এপাশ ওপাশ ফটাস ফটাস মশা মেরে, ভোর ভোর উঠে, লাল লাল দাগড়া হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে র-ডেটল লাগিয়ে নিতেন থুপে থুপে। সারা দিন রাত চলত ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস চুলকোনো, আর ক্ষণে ক্ষণে ডেটল বর্ষণ।

     এসব ঘটনা যদিও আমার জীবনের, তবু আমি নিশ্চিত, এ পোড়া দেশে এরকম মানুষরা সব পরিবারে, সব ফ্ল্যাটবাড়িতে, পাড়ায় কালোজিরের মত ছড়িয়ে আছে। তবে আমার মেসোর মতন মশা-অবসেসড মানুষের দর্শন কারুর হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও শুধু মেসো না বলে একে মেসো, মাসি আর মশার গল্প বলাই শ্রেয়। 

  মেসো আমার নিপাট ভদ্রলোক। আর শুধু ভদ্রলোক কেন, শিক্ষিত,মার্জিত, সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীতের অনুরাগী একজন সংবেদনশীল ব্যক্তি। তা এই মেসোর যে কটি ব্যাপারে অ্যালার্জি আছে তার মধ্যে মাসি ও মশা হল লিস্টের একদম ওপরে। সিলভার জুবিলি পেরোনো বউয়ের ওপর কার না বিতৃষ্ণা থাকে? তাই মাসির সাথে দাঁত-খিঁচুনির সম্পর্কটা নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন নেই, কিন্তু মশার মত একটা ক্ষুদ্র জীবকে নিয়ে তিনি যা করেন সেটা প্রায় ফোবিয়াই বলা চলে। ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়েন খুঁটিয়ে; তাই মাঝে মধ্যেই মশা ও তা বাহিত রোগ সম্মন্ধে যেসব ভয়ঙ্কর খবরগুলো বেরোয় সেগুলো তাঁর চোখ এড়ায় না। আর সেখানে ওমুক বা তমুক রোগের মশা চেনবার যে সহজ উপায়গুলো বাতলানো থাকে সেগুলো তিনি ভাল করে জেনে নেন। তারপর শুরু হয় নিরীক্ষণ। ওই ধরনের কোন মশা ঘরে ঢুকেছে কিনা বোঝবার জন্য ভদ্রলোক চেয়ারে কাঠের মত বসে থাকেন যাতে মশা এসে তাঁর গায়ে বসে। বসলে সেটাকে না মেরে, স্লো-মোশানে হাত তুলে, চোখের সামনে এনে মশার গড়নটা মিলিয়ে দেখেন কাগজের ইলাস্ট্রেশানের সঙ্গে। তারপর থাবড়ে মারেন শত্তুরটাকে। এই মেসোই একবার এক শত্রুকে 'কুল-হেডে' ব্যবহার করেছিলেন আরেক শত্রুকে ঘায়েল করতে: মাসি আমার মোটাসোটা, বেঁটেখাটো মানুষ। মশারির খুঁট লাগানো আর ডিঙি মেরে জিরাফকে বটপাতা খাওয়ানো তাঁর জন্য সমান চ্যালেঞ্জিং। এই মাসির সঙ্গে এক সন্ধের ফাটাফাটি ঝগড়ার পরে, রাগ করে নিরম্বু উপোষ দিয়ে মেসো মশারিটা বিছানার আধখানায় টাঙিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে, ওই ভরা মশার সিজনে, বাকি আধখানা খালি খাটে শুতে হয়েছিল মাসিকে। সেই রাতে, মশারির মধ্যে শুয়ে, আড়চোখে বাকি খাটটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভদ্রলোকের নিজের কূট-বুদ্ধির জন্য যে বিলক্ষণ গর্ব ও পুলক বোধ হয়েছিল তা আর বলে দিতে হয়না। আর হবে নাই বা কেন? এহেন পলিটিকালি কারেক্ট অথচ দুরন্তভাবে ইফেক্টিভ শাস্তিব্যবস্থার আবিষ্কার গ্যালারিভরা হাততালি ও নিশ্চিতভাবে স্বর্ণ পুরস্কারের যোগ্য। 

  কে বলে ব্যাঙের খাদ্য হওয়া ছাড়া মশার আর কোন কার্যকারিতা নেই? 

(আমার এই লেখাটি ''প্রতিদিন রোববার'-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)